ট্রেন চলাচলকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে অবৈধ ও অরক্ষিত রেলক্রসিং
ডিটেকটিভ নিউজ ডেস্ক
![]()
রেলপথে অবৈধ ও অরক্ষিত রেলক্রসিং ট্রেন চলাচলকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। ওসব রেলক্রসিংয়ে অহরহ দুর্ঘটনা ঘটছে। তাতে প্রাণ ও সম্পদহানী হচ্ছে। ২০১৪ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ৩ বছরে সারাদেশে লেবেল ক্রসিংগুলোতে দুর্ঘটনা ঘটেছে মোট ৮৩৭টি। ওসব ট্রেন দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান করে অকার্যকর সিগন্যাল ব্যবস্থা, লেবেল ক্রসিংয়ের অব্যবস্থা এবং চালকের সিগন্যাল অমান্য করাকে দায়ি করা হয়েছে। বর্তমানে সারাদেশে রেল নেটওয়ার্কে মোট ২ হাজার ৫৪১টি লেবেল ক্রসিং আছে। তার মধ্যে অনুমোদিত ক্রসিংয়ের সংখ্যা মাত্র ৭৮০টি। বাকি ১ হাজার ৭৬১টিই অনুমোদনহীন। আবার ৭৮০টি অনুমোদিত ক্রসিংয়ের মধ্যে মাত্র ২৪২টিতে রক্ষী বা গেউটকিপার আছে। ৫৩৮টি অনুমোদিত ক্রসিংয়ে রক্ষী বা গেউটকিপার নেই। অর্থাৎ আনম্যান হিসোবে রয়েছে মোট ২ হাজার ২৯৯টি লেবেল ক্রসিং। তাতে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে। ক্ষতি হচ্ছে রেল সম্পদের। সাধারণ মানুষ এখনো ট্রেনকে নিরাপদ ভ্রমণ বাহন বিবেচনা করে। আর ট্রেনের নিরাপদে চলার জন্য রেলপথ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এমন পরিস্থিতিতে রেলপথকে ঝুঁকিমুক্ত রাখার জন্য লেবেল ক্রসিংগুলোকে সুরক্ষিত করা খুবই জরুরি। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ এই বিষয়ের প্রতি খুব একটা নজর নেই রেল কর্তৃপক্ষের। বরং প্রতিনিয়ত সারাদেশেই অবৈধ লেবেল ক্রসিংয়ের সংখ্যা বাড়ছে। রেলওয়ে সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ কোন স্থানে নতুন রেললাইন নির্মাণ করলে প্রয়োজনে লেবেল ক্রসিং নির্মাণ করে সেখানে রক্ষী বা গেউটকিপার নিয়োগ দেয়া হয়। কিন্তু রেলকে না জানিয়ে বা অনুমোদন না নিয়ে এলজিইডি, সড়ক ও জনপথ বিভাগ, ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, সিটি কর্পোরেশনসহ বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থাও রেললাইনের উপর লেবেল ক্রসিং নির্মাণ করে থাকে। যা রেলওয়ের আইনে নিষিদ্ধ। এক সময় এই প্রবণতা এতো বেশি ছিল যে, তা রেল কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। ওসব ক্রসিংয়েই এখন প্রায়ই দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ঘটছে। রেলের সম্পদের ক্ষতি হচ্ছে। অতিসম্প্রতি গাজীপুওে অরক্ষিত রেলক্রসিং ট্রাক-ট্রেনের সংঘর্ষে প্রাণ গেল ট্রেন চালকের। গত ২৬ আগষ্ট খুলনা থেকে ঢাকাগামী সুন্দরবন এক্সপ্রেস একই স্থানে একটি মাছের ট্রাককে ধাক্কা দিলে ৩ জনের মৃত্যু হয়। চলতি বছরের ৮ জানুয়ারী কালিয়াকৈর উপজেলার গোয়ালবাথানের নয়ানগর এলাকায় রেলক্রসিংয়ে কলকাতাগামী মৈত্রী এক্সপ্রেস ট্রেনের ধাক্কায় প্রাইভেট কারে থাকা ৫ জন নিহত হয়। কয়েক বছর আগে একই এলাকায় সংগঠিত দুর্ঘটনায় ৪৮ জন প্রাণ হারায়। জয়দেবপুর থেকে বঙ্গবন্ধু সেতু পূর্ব পর্যন্ত কমপক্ষে ৬২টি রেলক্রসিং আছে। তার মধ্যে মাত্র ১২/১৩টিতে গেটকিপার বা রক্ষী আছে। বাকিগুলোতে নেই। যেগুলোতে গেটকিপার আছে সেগুলোর সিগন্যাল লাইট বহুদিন যাবত বিকল। তাতে ট্রেন চালককে ঝুঁকি নিয়ে ট্রেন চালাতে হয়। আর ঝুঁকিপূর্ণ রেলপথেই ট্রেনের গতিবেগ ঘণ্টায় ৮০ কিলোমিটার। এর কমে ট্রেন চালালে চালকদের জবাবদিহি করতে হয়। কারণ ট্রেনের টাইমটেবিল খাতা-কলমে হিসাব করে সময় নির্ধারণ করে দেন প্রকৌশলীরা। কিন্তু রেলপথের উপর রয়েছে শত শত অরক্ষিত রেলক্রসিং।
সূত্র জানায়, সারাদেশে অবৈধ ও অরক্ষিত রেলক্রসিং কিছুদিন পর পর কেড়ে নিচ্ছে তাজা প্রাণ। তারপরেও টনক নড়ছে না রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের। একটা দুর্ঘটনা ঘটলেই রেলক্রসিং নিয়ে সরব হয়ে ওঠেন সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারা। কিছুদিন পরে আবার তা ভুলে যান। চলতি বছর রেলওয়ের পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলের বেশ কিছু ট্রেনের গতি বাড়ানো হয়েছে। তাতে করে অবৈধ ও অরক্ষিত রেলক্রসিংগুলো আরো বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। অরক্ষিত ক্রসিংগুলোর আগে ট্রেনের গতি কমানো ছাড়া চালকদের উপায় থাকে না। সাবধানতার পরেও যে কোনো মুহূর্তে দুর্ঘটনা ঘটনার আশঙ্কা থাকে। কিন্তু নির্ধারিত গতিতে ট্রেন চালানোর জন্য চালকদের ক্রমাগত চাপে মধ্যে রাখা হয়। বলা হয়- ডিপার্টমেন্ট যে গতি নির্ধারণ করে দিয়েছে সেই গতিতে চালানোর। অবৈধ ও অরক্ষিত লেবেল ক্রসিং নিয়ে রেল কর্তৃপক্ষ শতাধিক মামলা করেছে। সেগুলো এখন বিচারাধীন আছে। কোনো কোনা মামলা সংশ্লিষ্ট বিভাগের কারণে মাঝপথে ঝুলে আছে। আর ঝুঁকিপূর্ণ লেবেল ক্রসিংগুলোতে রেল কর্তৃপক্ষ ‘সতর্কীকরণ’ সাইনবোর্ড টানিয়ে তাদের দায় এড়ানোর চেষ্টা করে। সেগুলো গাড়ির চালক বা জনসাধারণ মানে না। যেখানে গেইটম্যান দিয়েও দুর্ঘটনা এড়ানো যাচ্ছে না, সেখানে শুধু একটা সাইনবোর্ড মোটেও নিরাপদ নয় জেনেও রেল কর্তৃপক্ষ নিরব।
সূত্র আরো জানায়, মূলত রেলক্রসিংগুলোতে গেইটম্যান গেইট বন্ধ না করার কারণে রাস্তায় চলাচলকারী যানবাহনের সাথে ট্রেনের সংঘর্ষ বাধে। ওসব দুর্ঘটনায় অনেক যাত্রী হতাহত হন। অনেকে পঙ্গুত্ববরণ করেন। ওসব দুর্ঘটনা রোধ করতে হলে লেবেলক্রসিংগুলোকে সুরক্ষিত করতেই হবে। বাস্তবতা বিবেচনা কওে সেগুলো রাখা বা বন্ধ করার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে হবে এবং তা দ্রুত কার্যকর করতে হবে।